ঢাকা, আজ বুধবার, ২৩ জুন ২০২১

ভাসানচর ছাড়তে চায় রোহিঙ্গারা

প্রকাশ: ২০২১-০৬-০১ ১৫:০৮:১৫ || আপডেট: ২০২১-০৬-০১ ১৫:০৮:১৫

নুর মোহাম্মদ মিঠু, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
জাতিসংঘ ও পশ্চিমা কতিপয় বেসরকারি এনজিওসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জের মুখেই মিয়ানমার থেকে বাস্তচূত্য রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবির থেকে স্থানান্তর করা হয় ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সেসময় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় স্থানান্তরিত হওয়ার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও এখন ভাসানচরের রোহিঙ্গারা অভিযোগ করে বলছে, স্থানান্তরের পূর্বে তাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেগুলোর সব পূরণ করা হয়নি। এদিকে গত কিছুদিন ধরেই ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের পালানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ভাসানচরে নেয়া হয়েছিল, সেগুলোর সব পূরণ করা হয়নি।

মাসিক ভাতা ও প্রতিটি পরিবারকে গরু দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি ছিল তাও এখনো সবাইকে দেয়া হয়নি বলে রোহিঙ্গারা দাবি করছে। এখনো তৈরি করা হয়নি সেখানকার রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশুনার জন্য কোন স্কুলও। এছাড়া প্রতিমাসের খাওয়ার যে রসদ দেয়ার কথা তার ন্যূনতম কিছু সামগ্রী দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রোহিঙ্গাদের। আরও প্রতিশ্রুতি ছিল- কক্সবাজারে থাকা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করতে দেয়া হবে তাদের। কিন্তু চর ছেড়ে বাইরে যেতে পারছে না তারা। এদিকে খারাপ আবহাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ইতোমধ্যেই বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়েছে। চরটি খুব নিচু হওয়ায় প্রায়শই পানি প্রবেশ করে, যদিও তা ঠেকানোর জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তারও একটি ভেঙে গেছে বলে জানা গেছে। ভাসানচরের রোহিঙ্গারা আশঙ্কা করছেন, সামনে বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে বা কোনো সাইক্লোন তৈরি হলে তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে। সর্বোপরি এসব আশঙ্কা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবেই কক্সবাজারে ফিরে যেতে চান বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গারা। আর এসব কারনেই ইতোমধ্যে ভাসানচর থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গার পালিয়ে যাওয়া এবং পুলিশের হাতেও ধরা পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পর সম্প্রতি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের দুই কর্মকর্তাসহ একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পটি পরিদর্শনে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পরই রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ শুরু করে এবং এক পর্যায়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটায়। জানা গেছে, জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তাসহ ওই প্রতিনিধি দলটি সেখানকার রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলতেই গিয়েছিলেন সেখানে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তারাও ছিলেন দলটিতে। কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পর এবারই প্রথম ইউএনএইচসিআর-এর কোনও প্রতিনিধি সেখানে যায়।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দলটিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি নামার পরেই সেখানে রোহিঙ্গাদের একটি দল মিছিল করে এবং হেলিকপ্টাটির দিকে এগোতে শুরু করে। পুলিশ তাদের বাধাও দেয় এবং তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তখন রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ভাসানচরে ওয়্যারহাউজ নামের একটি ভবনের বাইরে জড়ো হয় এবং বিক্ষোভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে ইটপাটকেল দিয়ে ভবনটির কিছু জানালার কাঁচ ভাঙচুর করে। সেসময় পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানিয়েছেন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন। বিক্ষোভ-ভাঙচুরের কারণ জানতে পেরেছেন কীনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা ওনাদেরকেই (রোহিঙ্গাদের) জিজ্ঞেস করতে হবে। হুট করেই কেন করলো, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই কোনো … নাই। ওনাদের কথাও তো আমরা ঠিক বুঝি না।

এদিকে রোহিঙ্গারা বলছে, ভাসানচরে যাওয়া জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু ভাসানচরে অবস্থানরত প্রায় ১৯ হাজারের মতো রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে মাত্র কয়েকজন রোহিঙ্গাকে ”ফোকাল পয়েন্ট” হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। শুধুমাত্র তাদেরকেই কথা বলতে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন আর থাকতে চায় না। যেসব অসুবিধার কারণে তারা ভাসানচর ছাড়তে চায় তার পুরো চিত্র নিয়োগপ্রাপ্ত ফোকাল পয়েন্টের সদস্যরা তুলেও ধরেন না। যে কারণে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের কাছে তাদের বাস্তব অবস্থা কী, সে বার্তা পৌঁছাবে না- এমন আশঙ্কা থেকেই বিক্ষোভকারী রোহিঙ্গারা ফোকাল পয়েন্টের সদস্যদের পাশাপাশি তারাও কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বহু চেষ্টার পরও কথা বলার সুযোগ না পেয়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ উত্তেজিত হয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। একটি অংশ ভাঙচুর করার পর ওখানে অবস্থানরত বাকি রোহিঙ্গারা এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে বলেও জানা গেছে। যদিও পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলছেন, পরে জাতিসংঘের দলটি রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছেন। বিক্ষোভের কারণে একটু দেরিতে তারা কাজ শুরু করেন এবং ভাসানচরের পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলতে চেয়ে পারেনি বলেই বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে রোহিঙ্গারা এমন তথ্য জানেন কীনা- এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, প্রতিনিধি দলের কাছে যদি হাজার হাজার লোক যেতে চায়, তাহলে কী কথা বলতে পারবে? হেলিকপ্টার নামার সাথে সাথেই ওনারা বিক্ষোভ শুরু করেছে। কথা বলতে চেয়ে পারেনি- এগুলো ভুল তথ্য। তিনি বলেন, প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতের একটা প্রক্রিয়া আছে। তারা তো এর আগেই বিক্ষোভ শুরু করেছে।