ঢাকা, আজ সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১

বিদেশফেরত অভিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ -কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের

প্রকাশ: ২০২০-১১-২৫ ১৫:১১:৫২ || আপডেট: ২০২০-১১-২৫ ১৫:১১:৫২

স্টাফ রিপোর্টারঃ

বিদেশ থেকে ফেরত আসা অভিবাসী কর্মীদের করোনা মহামারীর ক্ষতিপূরণ এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর।

বুধবার কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘নিরাপদ অভিবাসন ও টেকসই পুনরেকত্রীকরণ: পরিপ্রেক্ষিত কোভিড – ১৯ মহামারী পরিস্থিতির উত্তরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তাগিদ দেন।

সুইজ এজেন্সী ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপরারেশন (এসডিসি) এবং রয়্যাল ডেনিশ অ্যাম্বাসীর অর্থায়নে পরিচালিত ‘সোশিও ইকোনোমিক রিইন্টিগ্রেশন অব রিটার্নি মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অব বাংলাদেশ (অনুপ্রেরণা)’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

আবুল ফজল মীর বলেন, করোনা মহামারী কেবল আমাদের জীবনেরই ক্ষতি করেনি, আমাদের জীবিকার ক্ষতি করেছে আরও বেশি। গত কয়েক মাসে আমাদের প্রবাসীরা রেকর্ড সংখ্যক রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। কিন্তু এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। তারা হয়তো মহামারীর কারণে তাদের যা কিছু সঞ্চয় সবটুকু দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাদের হাতে আর কোনো অর্থ অবশিষ্ঠ নাই। যাদের হাতে অর্থ আছে তাদেরও অনেকে জানেন না সে অর্থ কীভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। পরবর্তীতে তারা কীভাবে চলবেন সে বিষয়ে তাদের কোনো পরিকল্পনা নাই।

জেলা প্রশাসক বলেন, এজন্য  সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

বিদেশফেরতদের ডাটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ডাটাবেজ ধরে কাজ করলে বিদেশফেরতদের জন্য ফলপ্রসু উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে। সে জন্য ডাটাবেজে শুধু নাম ঠিকানা থাকলেই হবে না, বয়স, লিঙ্গ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ইত্যাদি উল্লেখ থাকতে হবে। তাহলে যার যে বিষয়ে অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা আছে তাকে সে বিষয়ে কাজে লাগানো যাবে।  জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহন করলে সম্মিলিতভাবে আমাদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহন সহজ হবে।

কর্মশালার প্রধান আলোচক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট  নীতিমালা প্রণয়ণ এবং তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বাজেটে তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তারা বিদেশে থেকে যে দক্ষতা বা যোগ্যতা অর্জন করে আসেন তার স্বীকৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে তাদেরকে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের জন্য  সবার আগে প্রয়োজন একটি পুর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ। আমার জানা মতে ব্র্যাক বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের ডাটাবেজ তৈরি করছে। কিন্তু ব্র্যাকের একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারিভাবে একটা সামগ্রিক ডাটাবেজ তৈরি।

বিদেশে থেকে ফিরে এসে যারা পুনরায় বিদেশ যেতে চান তাদেরকে দক্ষ করে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব আরোপে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আরেক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক অনন্য রায়হান বলেন, আমরা গবেষণা করে দেখেছি যে কোভিডকালে যে সকল নারীকর্মী বিদেশে থেকে ফিরে এসেছেন তাদের ৯৪ শতাংশ এবং পুরুষদের ৬৪ শতাংশ খালি হাতে ফিরেছেন। এদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকলে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তারা অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। তারা সামাজিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন সে ক্ষতি পুরণে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রেগ্রামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোভিড মোকাবেলায় জরুরি অর্থসহায়তা হিসেবে তাদের অনুপ্রেরণা প্রকল্প হতে শুধু কুমিল্লা জেলাতেই ৪১৭ জন বিদেশফেরত অভিবাসীকে সাড়ে বারো লাখ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। প্রকল্প হতে মোট প্রায় সাড়ে চার হাজার অভিবাসী বিভিন্ন বিষয়ের ওপর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তার মধ্যে কুমিল্লা থেকেই প্রায় ৭০০ জন এই প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রকল্প হতে ১৯০ জন বিদেশফেরত অভিবাসীকে ৮০ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

তারা আরও জানায়, নিরাপদ অভিবাসন এবং পুনরেকত্রীকরণ (রিইন্টিগ্রেশন) বিষয়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের মাঝে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন ‘শ জন বিদেশ ফেরত অভিবাসীকে মনোসামাজিক সেবা (কাউন্সেলিং) দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বিমানবন্দরে প্রায় ৭ হাজার বিদেশ ফেরত কর্মীকে তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তা দেওয়া হয় বলেও জানায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম হতে সহায়তা পাওয়া দুইজন বিদেশ ফেরত তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মোঃ নিয়াতুজ্জামান , অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আজিম উল আহসান প্রমুখ।

সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান।

এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারি কমিশনার এবং নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট নাছরিন সুলতানা নিপা, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষসহ কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।