ঢাকা, আজ সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০

কুমিল্লা দাউদকান্দি থেকে গোমতি নদীপথে পণ্য যাবে ত্রিপুরায়

প্রকাশ: ২০২০-০৮-২৩ ১৩:৪১:৩৭ || আপডেট: ২০২০-০৮-২৩ ১৩:৫৯:০২

অনলাইন ডেস্কঃ

ত্রিপুরার মহারাজারা বর্ষাকালে বজরায় চড়ে কুমিল্লায় আসা-যাওয়া করতেন। কুমিল্লার সঙ্গে আগরতলার ব্যবসা-বাণিজ্য চলত নৌপথেই। এক দেশ ছিল বলেই নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য তখন সহজ ছিল। কিন্তু দেশভাগের পর আন্তর্জাতিক সীমান্তের গ্যাঁড়াকলে পড়ে পরবর্তীকালে তা আর সম্ভব হয়নি। তবে সড়কপথে বাণিজ্য চলছে। নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরা কাটছে এবার।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার সঙ্গে প্রথমবারের মতো নৌপথে বাণিজ্য সুবিধা তৈরি হচ্ছে। কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে গোমতী নদী দিয়ে ত্রিপুরার সোনামুড়া পর্যন্ত এই নতুন নৌপথ চালু হবে। সেখান থেকে সড়কপথে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় যাবে পণ্যের চালান। শিগগিরই এই পথে পরীক্ষামূলক চালান নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেড বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে এই নৌপথ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সড়কপথে ত্রিপুরায় সিমেন্ট রপ্তানি করে। বিআইডব্লিউটিএ দু-এক দিনের মধ্যে অনুমতি দেবে বলে জানা গেছে।

বিআইডব্লিউটিএর সূত্রমতে, দাউদকান্দি থেকে গোমতী নদী দিয়ে মুরাদনগর, দেবীদ্বার, ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং, কুমিল্লা সদর ও বিবিরবাজার হয়ে সোনামুড়ায় পণ্য নেওয়া হবে। সেখান থেকে সড়কপথে পণ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় যাবে। দাউদকান্দি থেকে সোনামুড়ার দূরত্ব ৯২ কিলোমিটার।

এটি কোনো ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা নয়। এটি মূলত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্য আমদানি-রপ্তানির রুট হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারতের ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। সেখানে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী দরকার। আমাদের সামনে এ ধরনের নির্মাণসামগ্রী রপ্তানির বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সড়ক বা রেলপথের চেয়ে নৌপথে পণ্য পরিবহন তুলনামূলক সাশ্রয়ী। তাই প্রস্তাবিত নৌপথটি ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের নির্মাণসামগ্রী মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের নৌপথের বড় সমস্যা হলো নদীর নাব্যতা ও কম উচ্চতার সেতু। বড় বড় কার্গো জাহাজ চলাচল উপযোগী করতে নৌপথগুলোতে বিনিয়োগ করতে হবে।

বিআইডব্লিউটিএর একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি নৌপথটি পরিদর্শন করেছে। দলটি এই পথে কী ধরনের পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করতে পারবে, নদীর নাব্যতা কতটা আছে, পণ্য পরিবহনে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, কী ধরনের অবকাঠামো সুবিধা লাগবে—এসব পর্যবেক্ষণ করে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভারতেরও আগ্রহ থাকায় এই নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গোমতী নদীর নাব্যতা খুবই কম। তিন থেকে সাড়ে তিন ফুটের বেশি ড্রাফটের নৌযান চলাচলের উপযোগী নয়। এর মানে, বড় পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করা সম্ভব নয়। ফলে একটি নৌযানে খুব বেশি পণ্য আনা–নেওয়া করা যাবে না। এ ছাড়া গোমতী নদীর ওই পথে ২৩টি কম উচ্চতার সেতু আছে। ফলে সেতুর নিচে দিয়ে বড় নৌযান চলাচল করতে পারবে না।

বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই মাসেই পরীক্ষামূলকভাবে দাউদকান্দি থেকে ত্রিপুরার সোনামুড়া পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে সিমেন্টের চালান যাবে। যদি ভালো ফল পাওয়া যায়, তাহলে পথটি নিয়মিত ব্যবহার করা হবে। মেঘনা নদীর দাউদকান্দি এলাকার আশপাশে বেশ কিছু সিমেন্ট কারখানা আছে। এই নৌপথ ব্যবহার করে সহজেই ত্রিপুরায় সিমেন্ট রপ্তানি করা যাবে। ত্রিপুরায় এখন নির্মাণসামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা আছে।

ত্রিপুরার সঙ্গে সড়কপথেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। সুখবর হলো, ত্রিপুরা থেকে যত পণ্য আসে, এর চেয়ে অনেক বেশি পণ্য সেখানে রপ্তানি হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ২ লাখ ৯ হাজার ৯৬২ টন মাছ, খাদ্যপণ্য, পাথর, সিমেন্ট, সার ইত্যাদি রপ্তানি হয়েছে। এর বিপরীতে ত্রিপুরা থেকে ৯৯ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। একইভাবে ওই বছর বিবিরবাজার স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৫৮ টন পণ্য রপ্তানির বিপরীতে রাজ্যটি থেকে এসেছে মাত্র ৪৭৯ টন পণ্য। এর মানে, ত্রিপুরাসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা আছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার নৌ প্রটোকলের আওতায় নৌপথে বাণিজ্য হয়। নৌ প্রটোকলের আওতায় আগে কখনো ত্রিপুরার সঙ্গে সরাসরি পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়নি। তবে কলকাতা থেকে এ দেশে ফ্লাই অ্যাশ, ক্লিংকার, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য আসে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও নানা পণ্য যায়। ত্রিপুরার সঙ্গে নৌপথে বাণিজ্য শুরু হলে সার, সিমেন্ট, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

এ ছাড়া ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে নৌ প্রটোকলের আওতায় কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথে; পরে সড়কপথে আখাউড়া হয়ে আগরতলায় রড, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য যায়। ওই পণ্য অবশ্য ভারতীয়।

ত্রিপুরাসহ ভারতের ওই অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে সড়ক, নৌ ও রেলপথের উন্নয়ন করতে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছে সরকার। আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। আবার আখাউড়া থেকে আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন করতে ১১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বারইয়ার হাট থেকে রামগড় সীমান্ত পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করা হচ্ছে।