ঢাকা, আজ বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০

কুমিল্লার প্রতাপশালী যুবলীগ নেতা অধরা, উল্টো নিহতের পরিবারকে হুমকি

প্রকাশ: ২০২০-০৭-১২ ০৩:৪০:২৭ || আপডেট: ২০২০-০৭-১২ ০৩:৪০:২৭

অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশ্যে ষাটোর্ধ্ব চাচাতো ভাই ব্যবসায়ী আক্তার হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাঁকে ধরতে রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। সেই সঙ্গে ট্রেকিং করা হচ্ছে তাঁর মোবাইল ফোন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের ফোনও। প্রতাপশালী এই কাউন্সিলর গ্রেপ্তার না হলেও নিহতের পরিবারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নিহতের পরিবার জানিয়েছে প্রশাসন ও পুলিশকেও। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আসা এই কাউন্সিলর ও তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে এলাকায় অভিযোগের অন্ত নেই। চাঁদাবাজি, সালিসের নামে অর্থ আদায়, বিরোধপূর্ণ জমিতে ভাগ বসানো, ভূমিদস্যুতা ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। আপন চাচাতো ভাইয়ের পাঁচ শতক জমিও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এদিকে ষাটোর্ধ্ব চাচাতো ভাই আক্তার হোসেনকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কাউন্সিলরসহ তাঁর পাঁচ ভাইকে আসামি করা নিহতের স্ত্রী রেখা আক্তার বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কাউন্সিলরের তিন ভাইকে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। শনিবার আদালত বন্ধ থাকায় তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয় এবং পরে শুনানির কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার চাঙ্গিনী দক্ষিণ মোড়ের বায়তুল নূর জামে মসজিদের সামনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেন, তার ভাইসহ তাদের লোকজন আক্তার হোসেনকে পাইপ রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শনিবার বাদ আছর গন্ধমতি জামে মসজিদে নিহত আক্তার হোসেনের জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

দাফনের সময় নিহত আক্তার হোসেনের ছোট ভাই শাহজালাল আলাল অভিযোগ করে জানান, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানাভাবে আমাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। শুক্রবার ও শনিবার তারা হুমকি দিয়েছে। নিহতের স্ত্রী রেখা আক্তার আহাজারি করতে করতে জানান, কাউন্সিলর নির্বাচনের সময় আমরা আলমগীরের পক্ষে কাজ করেছিলাম। শুক্রবার যখন আমার স্বামীকে মারছিল তখন আমরা আলমগীর, জাহাঙ্গীরের কাছে মাফ চাইছিলাম। আমাদেরকে মাফ করে দে। কিন্তু মাফ করে নাই। আমার স্বামীরে মাইরাই ফেলছে।
পিতার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে নিহতের বড় মেয়ে শিরিন আক্তার জানান, তারা প্রভাবশালী, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই। প্রধানমন্ত্রী আমার মা। তার কাছে পিতা হত্যার বিচার চাই।

যা ঘটেছিল শুক্রবার সকালে-

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানাধীন চাঙ্গিনী মোড়ে ডিজিটাল কমিউনিকেশন দোকানে বসে আছেন শাহজালাল আলাল। এমন সময় কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনের ছোট ভাই বিল্লাল হোসেন দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সামনে এসে আলালকে বলে, ‘এই তুই আমার দিকে তাকালি কেন? আমাকে কিছু বলবি নাকি? তাকালি কেন? আলাল বলেন- আমি কোথায় তাকালাম? আপনি তাকালেন কেন? এ সময় কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন এসে ভীষণ রাগারাগি করে। পরে তার এক বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন এসে আলালের গায়ে হাত তোলে। এ সময় দোকানের সাথের আলালের বাড়ি, সেখান থেকে মহিলারা ছুটে আসেন। তাদের গায়েও হাত দেয় কাউন্সিলর ও তার ভাইয়েরা। কাউন্সিলরের ভাই জাহাঙ্গীর এ সময় পাশের ওয়েলডিংয়ের দোকান থেকে রড এনে ভাতিজা ছাত্রলীগের ওয়ার্ড সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল আহমেদের হাতে আঘাত করে। এতে তার আঙুল কেটে যায়। তাকে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ঘটনা জানানো হয়ে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত ও কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদকে।

শাহজালাল আলাল জানান, নামাজের সময় হয়ে চাঙ্গিনী দক্ষিণ মোড়ের বায়তুল নূর জামে মসজিদে যাওয়ায় জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় দেখলাম মসজিদের পাশে কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনদের একটি সেনিটারি দোকানে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করছে। পরে মসজিদে যাই নামাজ পড়ি। নামাজ পড়া শেষে বেলা পৌনে ২টার দিকে কাউন্সিলরের বড় ভাই আমির হোসেন আমাকে ডেকে নেয়। এ সময় তাদের ৪/৫ জন আমাকে ঘিরে ধরে এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একই সময়ে কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন, জাহাঙ্গীর মেম্বার, বিল্লাল হোসেন আমার বড়ভাই আক্তার হোসেনকে এলোপাথারি পিটাতে শুরু করে। একটু পড়ে দেখি ভাই নীচে পড়ে আছে। আমরা সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নেওয়া পথে ভাই মারা যায়। পরে তার লাশ থানায় নিয়ে যায়।

দ্বন্দ্ব ও অভিযোগ

২০০৬ সালের বিএনপিপন্থী ছিল এই কাউন্সিলর। কিন্তু সিটি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন পান। পরে পেয়ে যান কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ। কোটবাড়ি সড়কের রাস্তার পাশে ড্রেন নির্মাণের সময় তোলা মাটি বিক্রি করে ফেলে কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, শালিসের নামে অর্থ আদায়, বিরোধপূর্ণ জমিতে ভাগ বসানো, নতুন ভবন নির্মাণের সময় চাঁদাদাবি, ভূমিদস্যুতার অভিযোগ রয়েছে।

কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে চাঙ্গিনী বাজারের পাশে তার এক চাচাতো ভাইয়ের ৫ শতক জমি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দখল করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনের এক ভাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে সহকারি প্রকৌশলী তফাজ্জল হোসেনের সহায়তায় এলাকার ঠিকাদারি কাজ পাওয়া ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তার ভাই জাহাঙ্গীর মাদক বিক্রির সাথে জড়িত।

মামলা :

কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন ও তার ভাইয়েরা চাচাতোভাই আক্তার হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রেখা বেগম বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে চাঙ্গিনী দক্ষিণ মোড়ের বাসিন্দা কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনকে। সেই সাথে আসামি করা হয় তার আরো ৫ ভাইসহ ১০ জনকে। আলমগীর হোসেনের ভাই যারা আসামি তারা হচ্ছেন আমির হোসেন (৫৫), বিল্লাল হোসেন(৪০), জাহাঙ্গীর হোসেন (৫২), তোফাজ্জল হোসেন (৪৫) ও গুলজার হোসেন (৫৩)।

অপর আসামিরা হচ্ছেন গুলজার হোসেনের ছেলে নাজমুল ইসলাম আলিফ (২৪), নাজমুল ইসলাম তানভীর (২২), তুলাতলির মো: ইউনুসের ছেলে কাউসার আহাম্মেদ ভুট্টু (২৬), আমির হোসেনের ফেলে জোবায়ের হোসেন (২৮)। মামলায় অভিযোগ করা হয় কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন তার হাতে থাকা এসএস পাইপ দিয়ে নিহত আক্তার হোসেনের ঘাড়ে আঘাত করেন এবং অন্যরা এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি, লাথি মারেন। কাউন্সিলরের ভাই জাহাঙ্গীর ইট দিয়ে আঘাত করে আক্তার হোসেনের হাঁটু থেতলে দেন। পরে লোকজন অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় আক্তার হোসেন মারা যান। পরে অ্যাম্বুল্যান্সে করেই মরদেহ থানায় নিয়ে আসা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম দৃঢ়তার সাথে বলেন, কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন গ্রেপ্তার হবেন। কাউন্সিলর এবং তার সাথে যারা ছিল তাদের সবাই গ্রেপ্তার হবে। কারণ এটা প্রকাশ্যে ঘটনা ঘটেছে। কারা কারা জড়িত কারা কি করেছে সব প্রমাণ আছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে অবশ্যই চার্জসিট হবে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান।

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, কাউন্সিলর আলমগীরকে গ্রেপ্তারের শহরের সংরাইশ, বালুতুপাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছি। তার আত্মীয় স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের ঠিকানা সংগ্রহ করে গোয়েন্দা তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, জমি নিয়ে আপন চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ ছিল। আমি একবার কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে বসে ৬ ঘণ্টা বৈঠক করে বিষয়টা মিটমাট করে দিয়েছিলাম। কাউন্সিলর আলমগীরের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না খুঁজে দেখা হচ্ছে।

তিনি জোর দিয়ে জানান, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কাউন্সিলরকে এক নাম্বার আসামি করা হয়েছে। ২, ৩ ও ৪ নাম্বার আসামি গ্রেপ্তার আছে মোট আসামি ১০ জন। কাউন্সিলর নিজেও হামলায় অংশ নিয়েছে এর প্রমাণ পেয়েছি। একজন জনপ্রতিনিধি এতো মানুষের সামনে এমন নেক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে এর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার ওসি নজরুল ইসলাম আরো জানান, গ্রেপ্তারকৃত তিন ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন ও আমির হোসেনের ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালত বন্ধ থাকায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শুনানি শেষে আদেশ হতে পারে। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই জসিম উদ্দিন।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ