ঢাকা, আজ শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

ডাউন সিনড্রোম শিশুর যত্ন -ডা: রোকসানা হোসেন জেবা

প্রকাশ: ২০২০-০৭-০৩ ০১:৩৬:৩২ || আপডেট: ২০২০-০৭-০৩ ০১:৩৬:৩২

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ৮শ’ শিশুর মধ্যে এক জন ‘ডাউন সিনড্রোম’ শিশু জন্মগ্রহণ করে থাকে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৭ মিলিয়ন ডাউন সিনড্রোম লোক রয়েছে। আর বাংলাদেশে প্রতি বছর পাঁচ হাজার বা প্রতিদিন প্রায় ১৫টি ‘ডাউন’ শিশুর জন্ম হয়। বর্তমানে দেশে ২ লাখ ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি বসবাস করছে। এসব ব্যক্তিরা সমাজে অবহেলিত। অনেক পিতা-মাতা জানেন না তাদের আদরের শিশুটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত্র। অসুখের কথা জানলেও জানে না তার ডাউন সিনড্রোম সন্তানের সাথে তাদের কী ধরনের আচরণ করতে হবে, কীভাবে তাকে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো গড়ে তুলতে হবে। এসব বিশেষ শিশুদের সুস্থতা ও যথাযথ বিকাশ নিশ্চিতে পরিবারের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এদের সার্বিক উন্নয়নে চাই একটু বাড়তি নজর, বাড়তি যত্ন।
‘ডাউন সিনড্রোম’ কোনো রোগ নয় বরং এটি শরীরের একটি জেনেটিক পার্থক্য (ভিন্নতার মাত্রা) এবং ক্রোমোজোমের একটি বিশেষ অবস্থা। এই লক্ষণ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা নির্বোধ নয়, বরং কিছুটা ভিন্ন রকম। মূলত জন্মগত একটি ভূূূূলের কারণে এসব শিশু জন্ম নেয়। তবে সঠিক যত্ন, পুষ্টিকর খাবার, স্পীচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ফিজিক্যাল থেরাপি দিলে ডাউন সিনড্রোম শিশুরা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো পড়ালেখা করতে পারে। সচেতনতা ও ভালবাসা দিয়ে সমাজে তাঁদের প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ডাউন শিশু প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি এক বিশেষ ধরনের মানব সন্ত্মান।
২০১৩ সালে প্রণীত সমন্বিত “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩” এ প্রতিবন্ধিতার বেশ কয়েকটি ধরন বর্ণিত করা হয়েছে। এ আইনে ‘ডাউন সিনড্রোম’-এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে “কোনো ব্যক্তির মধ্যে বংশানুগতিক (মবহবঃরপ) কোনো সমস্য, যা ২১তম ক্রোমোজোম জোড়ায় একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং যার মধ্যে মৃদু হইতে গুরতর মাত্রার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিকতা, দুর্বল পেশীক্ষমতা, খর্বাকৃতি ও মঙ্গোলয়ড মুখাকৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, তিনি ‘ডাউন সিনড্রোমজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ বলে বিবেচিত হবেন।”
‘ডাউন সিনড্রোম’ কথাটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে পুরনো হলেও এদেশের মানুষ পরিচিত হয়েছে খুব বেশিদিন আগে নয়। মানুষের শরীরে প্রত্যেকটি কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৬ টি। এর মধ্যে ২৩টি ক্রোমোজোম বাবা এবং অন্য ২৩টি ক্রোমোজোম মায়ের কাছে থেকে আসে, যা জোড়ায় জোড়ায় দেহকোষ তৈরি করে। ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেহকোষে ২১তম ক্রোমোজোমে একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম পাওয়া যায়। অর্থাৎ ২১তম ক্রোমোজোমে তিনটি ক্রোমোজোম থাকে, যাকে ‘ট্রিজোমী টুয়েন্টি ওয়ান’ বলা হয়। এভাবে ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তির শরীরে প্রত্যেকটি কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭টি। বৃটিশ চিকিৎসক জন ল্যাঙ্গডন ডাউন ১৮৬৬ সালে এ শিশুদের চিহ্নিত করেন বলে তার নামানুসারে ‘ডাউন সিনড্রোম’ কথাটি প্রচলিত হয়। প্রতি ৫শ’ থেকে ৭শ’ শিশুর মধ্যে একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে পারে। আমাদের শরীর গঠনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে কোষ বা সেল বলা হয়। কোটি কোটি ডিএনএ’র সমন্বয়ে এক-একটি ক্রোমোজোম তৈরি হয়। এ ডিএনএ-কে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন- আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং সবকিছুই এ ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানব শরীরে এ ডিএনএ বা ক্রোমোজোমের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে নানারকম শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি দেখা দেয়, যাদের আমরা সাধারণভাবে জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ত্রুটি বলে থাকি।
ডাউন সিনড্রোম লক্ষণ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের কিছু শারীরিক ও মানবিক লক্ষণ দেখা যায়। এই শিশুগুলো খুব নরম তুলতুলে হয়। লো মাসেল টোনের কারণে শরীরটা একটু ফোলা ফোলা হয়; অনেকের মধ্যে জিহ্বাটা একটু বের করে রাখার প্রবণতা থাকে। মুখমন্ডল ছোট হয়, থুতনি সেভাবে বোঝা যায় না, গলা ছোট হয়; এ শিশুদের মাংসপেশির শিথিলতা, বামনতা বা কম উচ্চতা, চোখের কোণ ওপরের দিকে ওঠানো, চ্যাপ্টা নাক, ছোট কান, হাতের তালুতে একটিমাত্র রেখা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়; কানে কম শোনা, কথা বলতে দেরি হওয়া, কম বুদ্ধি ইত্যাদি জটিলতা থাকে; হাঁটাচলা ও মাংসপেশির গঠন সঠিক হয় না; আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তা অনেক কম হয়। ৩০ বছর বয়সের পর সমস্যা আরো বাড়ে; অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তরা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে; কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত্মদের অল্প বয়সেই হৃদরোগের সমস্যা হয়। আর কিছু ক্ষেত্রে বয়স বাড়লে হার্টের সমস্যা গুরম্নতর হয়ে ওঠে; টেস্টিকুলার ক্যান্সার ও লিউকোমিয়ায় আক্‌্রান্ত্ম হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে; দাঁতে সংক্রমণ বা দাঁত পড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়; জন্মগতভাবে কিছু রোগ যেমন্ত অ্যানেটশন ডিফিক্ট হাইপার অ্যাকটিভিটি (এডিএইচডি) হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডাউন সিনড্রোম এমন একটি জেনেটিক রোগ যা সাধারণত বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যে এবং কোন কিছু শেখার অক্ষমতায় প্রকাশ পায়। ডাউন সিনড্রোমের বাচ্চাদের জন্মের পরেই কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়, যেমন- শিথিল শরীর এবং মাংস, চোখের কোনা উপরের দিকে বাঁকা, হাতের তালুতে শুধু একটি ভাঁজ (পামার ক্রিজ), জন্মের সময় ওজন এবং দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকের থেকে কম থাকা ইত্যাদি। যদিও এসব বাচ্চাদের চেহারায় কয়েকটি একই রকম বৈশিষ্ট্য থাকে, এদের চেহারায় বাবা-মার সাথে অনেক মিল থাকে। প্রত্যেকটি ডাউন সিনড্রোমের বাচ্চা আরেকটি বাচ্চা থেকে আলাদা। তাদের চেহারা আলাদা, তাদের বেড়ে ওঠার ধরন আলাদা, তাদের শেখার ক্ষমতা আলাদা।
এ রোগে আক্রান্ত্ম শিশুর আই কন্ট্রাক্ট করতে সমস্যা হতে পারে এবং যেকোনো একটা বিষয়ের উপর বেশিক্ষণ মনোযোগ থাকেনা। বুদ্ধিগত সমস্যার কারণে চিন্ত্মা করতে এবং কোনো কিছু মনে করতে পারেনা। শিশু কখনও কাল্পনিক এবং একা একা খেলতে পারে না। দেওয়া-নেওয়া অথবা আদান-প্রদানে শিশুর সমস্যা থাকে। শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতার কারণে সামাজিকভাবে ভাষাকে ব্যবহার করতে পারে না। অন্য ব্যক্তির সাথে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সমস্যা থাকে। হাসতে সমস্যা হয়। সামাজিক ভাষা ব্যবহারে সমস্যার কারণে শিশু কোন কিছুর কারণ বা উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। নির্দেশ অনুসরণ করতে পারে না। শরীর ভারী, তুলতুলে থাকে তাই খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করতে বিলম্ব হয়। তাই অন্যের সাথে সম্পর্ক করতে চায় না। তাদের উচ্চারণে কিছু সমস্যা থাকে কারণ তাদের ‘হাইপোটনিয়া’, ‘মাইক্রোগেস্নাসিয়া’, ‘হাই প্যাটাল আর্ক’ থাকে। কেউ কেউ ‘নন-ভার্বাল’ থাকে এবং অনুকরণে সমস্যা থাকে। তারা অনেক সময় বস্তুর নাম, খেলার নাম শিখতে পারে না এবং ‘ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন’ বুঝতে পারে না কারণ ‘হাইপো-রিফ্লেকসিভ’ সমস্যা থাকে। ভাষা বিকাশের বিলম্বতার কারণে ভাষা বুঝতে পারে না, বলতে পারে না এবং ব্যবহারও করতে পারে না। একটা ডাউন সিনড্রোম বাচ্চার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশেষের সমস্যাগুলো একটা পরিবারের সদস্যের উপরে অনেক ধরনের প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যত বেশি বয়সে মা হবেন, সন্ত্তানের ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্মের আশংকা তত বেশি। ২৫ বছর বয়সী প্রতি ১২শ’ জন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজন, ৩০ বছর বয়সী প্রতি ৯শ’ জনের মধ্যে একজন, আর ৪০ বছর বয়সী প্রতি ১শ’ জন মায়ের মধ্যে একজনের ডাউন শিশু জন্ম নেয়ার আশংকা থাকে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অসচেনতার কারণেই দেশে ডাউন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে আশার কথা, গর্ভবতী নারীর শরীর পরীক্ষা করে, এখন দেশেই ডাউন শিশু শনাক্ত করা সম্ভব। ডাউন শিশুরা সাধারণত প্রতিবন্ধী শিশু হিসেবে বেঁচে থাকে। তারা অন্য শিশুদের তুলনায়, শারীরিক ও মানসিকভাবে দেরিতে বেড়ে ওঠে। বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা বা কথা বলতে শেখার মতো বিষয়গুলো এসব শিশুদের ক্ষেত্রে দেরিতে হয়। আবার এদের অনেকেই এসবের কোনোটি কখনোই শেখে না। বিভিন্ন পরিচর্যার মাধ্যমে শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। যেহেতু ডাউন সিনড্রোম কোনো রোগ নয় তাই এটি নিরাময় হবার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল প্রয়োজন হয়।
সমাজকল্যান মন্ত্রণালয় প্রতিবন্দিদের জন্য গৃহীত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর আরোপিত বাধা, কুসংস্কার এবং নেতিবাচক ধ্যানধারণাগুলো দূরীকরণে মন্ত্রণালয়সহ অধিন্যস্ত্ম দফতর সংস্থাগুলোও সচেষ্ট। মানবসম্পদ হিসেবে তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও দৃঢ়তাকে কাজে লাগিয়ে সরকার তাদের উন্নয়নে মূলধারায় আনয়নে সচেষ্ট। বর্তমান সরকার এসব বিশেষ শিশুদের পুরস্থাপনে সংবেদনশীল। ফলে ইতোমধ্যেই প্রতিবন্দি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ প্রনয়ন করা হয়েছে।
উন্নত বিশ্বে প্রত্যেকটি গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি ও তা নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে মা হওয়াকে নিরম্নৎসাহিত করা হয়। মেধাবী শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে হলে ডাউন শিশুর মতো প্রতিরোধযোগ্য প্রতিবন্ধী বা জন্মগত ত্রুটির বিষয়টি পাঠ্য বইতে অন্ত্মর্ভুক্ত করতে হবে। গর্ভবতী নারীর সেবায় অনাগত শিশুর জন্মগত ত্রুটির বিষয়টিকে গুরম্নত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যমগুলোতেও এ বিষয়ে ব্যাপক প্রাচার কার্যক্রম চালালে জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে এবং সুস্থ শিশুর জন্ম দেয়াসহ বিশেষ এসব শিশুদের জন্য সুন্দর সমাজ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।
(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)