ঢাকা, আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০

বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্ন টয়লেট শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ায় -ইয়াসমীন রীমা

প্রকাশ: ২০২০-০৬-২৪ ১৪:৩১:০৫ || আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১৪:৩১:০৫

জ্ঞানচর্চা ও প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাসায় প্রায় সমপরিমাণ সময় অতিবাহিত করে। সে জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গৃহপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  অস্বস্থি  নিয়ে জ্ঞানচর্চা ও প্রতিভার বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শরীরবৃত্তীয় বিভিন্ন কারণে একজন মেয়েকে সারাদিনে পুরুষদের  তুলনায় বেশি বার টয়লেটে যেতে হয়। কিন্তু দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথোপযুক্ত টয়লেটিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
হৃদি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। গতমাসে তার প্রথম পিরিয়ড হয়েছে। প্রথমবারের মতো এমন অবস্থার মুখোমুখী হওয়ায় রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিলো হৃদি। বিষয়টি সে তার মাকে জানায়। হৃদির মা সেতারা ইসলাম পুরো বিষয়টির স্বাভাবিকতা তাকে বুঝিয়ে বলে এবং স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করে দেয়। মা হৃদিকে আরো জানান, প্রতিমাসেই এমনটা ঘটবে, থাকবে তিনদিন থেকে পাঁচদন পর্যন্ত । হৃদি তিন দিন স্কুলে যায়নি। তাছাড়া ক্লাসের বন্ধুদের সাথে এই নিয়ে আলাপ করার সুযোগও হয়নি তার।
আজ স্কুলে আসার সময় পেটে সামান্য ব্যথা অনুভব করেছিল হৃদি। প্রথমে বুঝতে পারেনি কেনো ব্যথা করছে। স্কুলে এসে বুঝতে পারলো তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে। হৃদি এজন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলনা। ফলে চিন্তায় পড়ে গেছিল পরিস্থিতি কিভাবে সামলে নিবে। ন্যাপকিন কোথায় পাবে ! ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্লাসমেট রেবেকাকে জানালে সে একটি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু স্কুলের কমন টয়লেটগুলোর অবস্থাও বেশি ভালো না দরজা ভাঙ্গা, অপরিচ্ছন্ন। এ অবস্থায় হৃদির টয়লেট ব্যবহারকালে তার বান্ধবী টয়লেটের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে, যদিও টয়লেট নিয়ে ছাত্রীদের অভিযোগ অনেকবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
উপরের এ চিত্র শুধুমাত্র হৃদির স্কুলের চিত্র নয়। আমাদের দেশে এমন অনেক স্কুল আছে যেগুলি লেখাপড়ায় প্রসিদ্ধ হলেও অকাঠামোগত দিক থেকে বিশেষ করে তাতে টয়লেটের অবস্থা বেশ নাজুক। সরকার স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে অনেক সজাগ। সরকারি অনুদান পেলেও অনেক সময় স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে টয়লেট সুবিধাসহ অন্যান্য অনেক সুবিধা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের টয়লেটের অবস্থা খুবই দুঃখজনক। এমনকি অনেক স্কুলে ওয়াসরুমে হাত ধোয়ার মতো সাবান বা হ্যান্ডওয়াসও নেই।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক প্রাক্তন উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এটি একটি জাতীয় ইস্যু, যা বাস্তবায়নে ‘লো কষ্ট ক্যাম্পেইন’ আরম্ভ করা যেতে পারে। তাছাড়া স্কুল স্যানিটেশন বিষয়ে সুফল পেতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতগুলোকে সংযুক্ত করতে হবে। শিক্ষকদের উচিত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক পাঠ বিষয়েও বিশদ ধারণা দেয়া। আমাদের স্কুলগুলিতে অপরিচ্ছন্ন টয়লেটের কারণে পিরিয়ড চলাকালীন অনেক মেয়েই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে অনেক মেয়ের উপস্থিতির হার কমে যাওয়ায় তারা উপবৃত্তি থেকেও বঞ্চিত হয় অনেক ক্ষেত্রে। আবার যারা এ সময়ে বিদ্যালয়ে যায় এবং অপরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করে, তাদের জন্য তা বিশাল স্বাস্থ্যঝুকি তৈরি করে।
আবার দেখা গেছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের পাশাপাশি অধিকাংশ স্কুল-কলেজের টয়লেটের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে নিরাপত্তা বেশ কম- কে টয়লেটে ঢুকছে ও বের হচ্ছে সহজেই তা দেখা যায়। এতে ছাত্রীরা অনেক সময় অস্বস্থি বোধ করে, টয়লেটে যেতেই চায় না। এ অবস্থায় ছেলে ও মেয়েদের টয়লেট আলাদা জায়গায় থাকা জরুরি। মেয়েদের টয়লেট এমন হওয়া উচিত যেখানে যথেষ্ট প্রাইভেসি আছে। আবার কোথাও কোথাও টয়লেট মূল বিল্ডিং থেকে দূরে হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টিতে প্রয়োজন হলেও ছেলেমেয়েরা তা ব্যবহার করতে পারে না। এমন অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে কোনো প্রান্ত থেকে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে ছাউনির নিচ দিয়ে টয়লেটে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের টয়লেট অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, দুর্গন্ধযুক্ত; দ্রুত সেসব টয়লেট সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। যেসব টয়লেটের দরজায় ছিটকিনি থাকে না, দ্রুত সেসব টয়লেটের প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
ইউনিসেফের এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি ছাত্রছাত্রী স্কুলের টয়লেটের কারণে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের টয়লেট সুবিধা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যেমন প্রয়োজনীয় সংখ্যক টয়লেট নেই, তেমনি অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট থাকার পরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে তা ব্যবহার উপযোগী নয়। ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারছে না। অপরিষ্কার টয়লেট রোগব্যাধি ছড়ায়। স্কুলে প্রতি ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট থাকা প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে প্রতি ১৮৭ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য একটি টয়লেট রয়েছে। প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টয়লেট থাকলেও মাত্র ২৫ ভাগ টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন্‌। ৮৪ ভাগ স্কুলে উন্নত টয়লেট থাকলেও এগুলোর মাত্র ৪৫ ভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। মাত্র ৩৫ ভাগ স্কুলে হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির সুবিধা রয়েছে, যদিও সরকার বিদ্যালয়ের পরিবেশ, বিশেষ করে টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে বারবার নির্দেশনা দিয়েছে।
স্বাভাবিক নিয়মে বয়সন্ধিকালে ছাত্রীদের পিরিয়ডকালীন সময়টাতে রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসময় শরীর দূর্বল ও মেজাজ খিটখিটে থাকে। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির একজন মেয়ের কাছে এ অবস্থা একেবারেই নতুন এক পরিস্থিতি। ওই সময় তাদের মধ্যে ভীতি ও আশঙ্কাও বিরাজ করে। এ অবস্থায় একজন মেয়ে যখন স্কুলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাটুকু যথাযথভাবে সম্পন্ন করার পরিবেশ এবং উপকরণ না পায়, তখন সে বিশেষ দিনগুলোতে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের ঋতুকালীন বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একজন শিক্ষিকাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়ার কথা বলা আছে এবং ছাত্রীদের বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। দেখা গেছে অনেক সময় ৮৬ শতাংশ মেয়ে পিরিয়ডকালীন গড়ে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত্ম স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। টয়লেট ব্যবস্থা স্বাস্থ্যকর হলে এবং জরম্নরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ন্যাপকিনসহ অন্যান্য জিনিষের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে, এ সময় ছাত্রীদের স্কুলে অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।
এ ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টয়লেট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নতকরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৩/০৬/২০১৫ তারিখে ১১টি নির্দেশনা সংবলিত পরিপত্র জারি করে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিকে টয়লেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের নির্দেশনাও দেয়া হয় পরিপত্রে। টয়লেটে প্লাষ্টিকের পাত্র রাখা, জেন্ডারবান্ধব স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, ছাত্রীদের পিরিয়ডের বিষয়ে একজন শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে পরিপত্রে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। সরকারের নির্দেশনা যথাযথ এবং আন্তরিকভাবে বাস্ত্মবায়ন করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য।
বিদ্যালয়ের টয়লেটগুলির জানালা ছোট থাকার ফলে প্রয়োজনীয় আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারেনা। আবার বিদু্যত সংযোগ থাকলেও বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের টয়লেটে বাল্ব থাকেনা। বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা ও অপসারণের সুব্যবস্থা থাকা বাঞ্চনীয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে কিচেন রাখা, হাইজেনিক ল্যাট্রিন নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো, বিদ্যালয়ে মূল ভবনের সাথে টয়লেট রাখা এবং তা পরিচ্ছন্ন রাখতে আলাদা তহবিল রাখা, স্টুডেন্ট কাউন্সিল জোরদার করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ। এগুলো করতে পারলে স্কুল স্যানিটেশনের মান কাঙ্খিত পর্যায়ে নেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে শুধু সরকারই না, যার যার অবস্থান থেকে সকলের ভূমিকা রাখতে এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
শিশুরা কমপক্ষে পাঁচ ঘন্টা স্কুলে কাটায়। এ সময়ে তাদের স্বাভাবিক টললেট সুবিধা না পাওয়া অমানবিক। অপরিষ্কার টয়লেট ব্যবহারের কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা নানা রোগ জীবাণুতে সংক্রমিত হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি থেকে পরিবার ও সমাজে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। স্কুল স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার ২০২৩ সালের মধ্যে শতভাগ স্কুলে ছেলেমেয়েদের জন্য পরিচ্ছন্ন টয়লেট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ সফল করতে আমাদের সকলের সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের সচেতনতা এবং সমন্বিত প্রচেষ্টা দিয়ে স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ টয়লেট নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু আমাদের এগিয়ে আসা আর হাত বাড়িয়ে দেয়া আন্ত্মরিকতার সাথে।
(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম বিষয়ক ফিচার)