ঢাকা, আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০

আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক “পলাশী দিবস” বাঙালী জাতির ইতিহাসে কালো অধ্যায়

প্রকাশ: ২০২০-০৬-২২ ২৩:৫৩:৪৫ || আপডেট: ২০২০-০৬-২২ ২৩:৫৩:৪৫

 

আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের জুন ২৩ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধ হারার কারনে বাংলার তথা ভারত বর্ষের স্বাধীনতার সূর্য ১৯০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।


ভূমিকা : চুক্তিস্বাক্ষর সত্ত্বেও পরিকল্পিত ‘বিপ্লব’ বাস্তবায়নের জন্য ইংরেজদের সিলেক্ট কমিটি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ে। সরাসরি মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হবে না মীর জাফরের নিকট অভিযান পরিচালনার কৌশল জানার জন্য আরও অপেক্ষা করবে এ নিয়ে ১১ জুন সিলেক্ট কমিটি ধীর ও সতর্ক চিন্তাভাবন করতে থাকে। সিলেক্ট কমিটিতে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয় ‘বর্তমান সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে সুবিধাজনক কাজ হবে মীরজাফরের পক্ষে বিপ্লব বাস্তবায়ন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা, কেননা বিলম্ব হয়ে গেলে ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে যাবে এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যাবে। সম্মিলিত দেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে তখন ব্রিটিশদের একা থাকতে হবে মাঠে। তদানুসারে ১৩ জুন ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। কাটোয়া পৌঁছেন ক্লাইভ ১৯ জুন। স্থানটি আগের দিনই কর্নেল কুট দখল করে নিয়েছিলেন। ২১ জুন ক্লাইভ সমর পরিষদের সভা ডাকেন এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বরং মীরজাফরের চূড়ান্ত চিঠির অপেক্ষায় থাকেন। সেই প্রতীক্ষিত বার্তাটি পেয়ে যান ক্লাইভ ২২ জুন। ২২ জুন ক্লাইভ তার বাহিনী নিয়ে পলাশীর পথে যাত্রা করেন। দুপুর রাত্রের পর পলাশী এসে উপস্থিত হন। সিরাজউদ্দৌলা তার বিশাল বাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে রওনা দেন এবং শক্রকে মোকাবেলা করার জন্য পলাশীতে শিবির স্থাপন করেন।


১৭৫৭ সালের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলী, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথ রোধ করে নি। ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পারেন, তাঁর সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল।
বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজ মীর জাফরকে বন্দি করার চিন্তা পরিত্যাগ করেন। তিনি মীর জাফরকে ক্ষমা করে তাঁকে শপথ নিতে বলেন। মীর জাফর পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না। গৃহবিবাদের মীমাংসা করে নবাব রায় দুর্লভ, ইয়ার লুৎফ খান, মীর জাফর, মীর মদন, মোহন লাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে সৈন্য চালানোর দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেন।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তর : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টায় যুদ্ধ আরম্ভ হয়। মীর মর্দান, মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী, নবসিং হাজারী প্রমুখের অধীনে নবাব বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালান। অন্যদিকে মীরজাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ রায়ের অধীনে নবাবের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সৈন্য ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ও পরিস্থিতি অবলোকন করে। বেশ কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পরও চূড়ান্ত কিছু ঘটেনি। এমন প্রতিরোধ ক্লাইভও আশা করেনি এবং এই মর্মে জানা যায় যে, দিনে যথাসম্ভব তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে ক্লাইভ রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বেলা তিনটার দিকে কামানের এক নিক্ষিপ্ত গোলায় মীরমর্দানের আকস্মিক মৃত্যুতে হতভম্ভ নবাব মীরজাফরকে ডেকে পাঠান। বাংলার স্বাধীনতার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মীরজাফরের কাছে আকুল অনুরোধ করেন। মীরজাফর নবাবকে ওই দিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন এবং এ খবরটি গোপনে ক্লাইভের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
পরামর্শমতো নবাবের সেনাদল পিছু হটতে থাকলে ইংরেজ সৈন্যরা নতুন উদ্যমে প্রচন্ড আক্রমণ চালায় ফলে নবাবের বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র পালিয়ে যায়। অপরাহ্ণ ৫টার দিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা শুরু করে। জনউড নামক একজন ব্রিটিশ সৈন্য পলাশী যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষায় এটাই ছিল সেই বিশিষ্ট ও চূড়ান্ত যুদ্ধ, যেখানে কোন ব্যাপক আক্রমণ ছাড়াই যুদ্ধজয় ও রাজ্য জয় করা যায়। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয় ছিল সামরিক নয়, সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক। নবাব যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন এবং পরদিন সকালে মুর্শিদাবাদে পৌঁছেন। মুর্শিদাবাদে ফিরে নবাব তার সৈন্যদলকে একত্রিত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। বেগম লুৎফুন্নেছা ও কন্যাকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ হতে রাজমহলের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু রাজমহলের নিকটে মীরজাফরের জামাতা মীরকাশিমের হাতে ধরা পড়েন এবং মুর্শিদাবাদে নিহত হন। মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

শিক্ষা: –
১. ষড়যন্ত্র সাথে সাথে রুখে দেওয়া।
২. যুদ্ধ ময়দানে কোন সমযোতা নয়।
৩. জনগনের মন জয় করে শাসন করা।
৪. সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে দুরে থাকা।
৫. ক্ষমতার লোভ না করে দেশপ্রেমিক হওয়া।
৬. ক্ষমতাবিকেন্দ্রীক করা ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা।
৭. আত্মিয়করণ না করে দক্ষ লোককে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া।