ঢাকা, আজ বুধবার, ২৩ জুন ২০২১

কুমিল্লায় ৩দফায় পিটিয়ে হত্যা; বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফন করলো পুলিশ!

প্রকাশ: ২০২১-০৫-১৭ ১৩:৩৬:২৬ || আপডেট: ২০২১-০৫-১৭ ১৩:৩৬:২৬

মাহফুজ বাবু;
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ২নং উত্তর দূর্গাপুর ইউপি এলাকার দিঘিরপাড় (ঘোরামারা) এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মনির হোসেন (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে ৩ দফায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যুর আগে গুরুতর আহত অবস্থায় মনির কে চোর হিসেবে থানায় নিয়ে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। প্রতিপক্ষের আসামীরা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বলে কুমেক হাসপাতালের ইমারজেন্সী বিভাগে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় রবিবার দিবাগত রাতে নিহতের স্ত্রী সালমা বেগম বাদী হয়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে কোতয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

৩ কন্যা সন্তানের জনক নিহত মনির একই উপজেলার বলরামপুর এলাকার মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে।

নিহত মনিরের স্ত্রী সালমা, ভায়রা আলমগীর, এলাকাবাসী ও কোতোয়ালি মডেল থানা সূত্রে জানা যায়, পেশায় দিনমজুর ও ফেরিওয়ালা মনির হোসেন দূর্গাপুর দিঘিরপাড় এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। কিছুদিন আগে মনির তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন মেরামতের জন্য দীঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী কৃষ্ণনগর এলাকার তৌহিদকে দেন। পরে গত ১১মে সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনের জন্য দোকানে গেলে তৌহিদ ও মনিরের মাঝে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার জেরে পরদিন ১২মে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে তৌহিদ তার সহযোগী এরশাদ, আজাদ, রাশেদ মিয়া ও জাহিদসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন মনিরকে পুনরায় মারধর করে আহত করে। এর পরদিন গত ১৩মে মনিরের ভাড়া বাড়ির অদুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে মনিরকে একা পেয়ে তৌহিদ, মনির, এরশাদ, আজাদ, রাশেদ মিয়া, জাহিদ, আমির আলী ও আরিফ হোসেন সহ কয়েকজন একটি ট্রাক্টরে তুলে কৃষ্ণনগর ঘোড়ামারা এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে ট্রাক্টরের সাথে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে নির্মম নির্যাতন ও মারধর করে। এরপর গুরুতর আহত অবস্থায় মনির কে চোর হিসেবে থানায় নিয়ে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। উল্লেখিত আসামীরা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বলে ভুল ঠিকানা দিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমারজেন্সী বিভাগে রেখে পালিয়ে যায়। সেদিন রাতেই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পর দিন (১৪ মে) হাসপাতাল থেকে কোতয়ালি মডেল থানায় খবর দেয়। পিবিআই কতৃক নিহতের ফিঙ্গার প্রিন্টের তথ্য অনুযায়ী নারায়নগঞ্জের হুমায়ুন কবির নামের এক ব্যাক্তির নাম ঠিকানা পাওয়া যায়। সে ঠিকানায় যোগাযোগ করে কাউকে না পাওয়ায় ময়নাতদন্তের পর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফনের জন্য মরদেহ আঞ্জুমানে হস্তান্তর করে পুলিশ। পরদিন ১৫মে নগরীর টিক্কারচর কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে মনিরের দাফন সম্পন্ন হয়।

এদিকে মনিরের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের লোকজন একাধিকবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ সহ বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার ও থানা হাজতে খোঁজ করতে থাকে। কুমেক হাসপাতালে রেজিস্ট্রারে মনির নামের এক ব্যক্তির ভর্তি উল্লেখ থাকলেও রোগীর অবস্থান ও ছাড়পত্রের বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল ১৬মে রাতে থানায় অভিযোগ করতে গেলে থানা পুলিশের কাছে থাকা হাসপাতালের মর্গে তোলা অজ্ঞাত লাশের ছবি দেখে নিহত মনিরের স্ত্রী তার স্বামী কে শনাক্ত করেন। মূলত এরপরই একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু সকল ঘটনা।

নিহত মনির হোসেনের ভায়রা ভাই আদর্শ সদর উপজেলার ২নং দুর্গাপুর উত্তর ইউপির ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি আলমগীর হোসেন ও শ্যালক সালাউদ্দিন প্রতিবেদক কে বলেন, মনিরকে মারধর করে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এ নিয়ে আমাদের নিশ্চিত কোন ধারণা ছিল না। তাই হাসপাতাল, কারাগার খুঁজে না পেয়ে থানায় অভিযোগ করতে গেলে ছবি দেখে সকলে নিশ্চিত হই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ব্যক্তিই মনির হোসেন।

নিহত মনিরের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, মামলায় অভিযুক্ত এরশাদ ও তৌহিদ তার অপর সহযোগীদের নিয়ে আমার স্বামীকে চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাকে মেরে রক্তাক্ত করে থানায় চালান দিতে ব্যর্থ হয়ে তারাই হাসপাতালে নিলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে সেখান ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনার বিষয়ে এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষ্ণনগরে ট্রাক্টরের সাথে বেঁধে মনিরকে ভয়ানক নির্যাতন ও মারধরের ঘটনার বর্ণনা দেন। এলাকাবাসী ও মনিরের স্বজনরা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

জানতে পেরে ১৭মে সকালেই ঘটনাস্থলে তদন্তে আসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহান সরকার, কোতয়ালী মডেল থানার ওসি আনোয়ারুল হক সহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা। ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহান সরকার জানান, হাসপাতাল থেকে অজ্ঞাত লাশ হিসেবে ওই ব্যক্তির মরদেহ দাফন করার আগে বিধি মোতাবেক ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। পরে তার পরিবারের লোকজন এসে ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেছেন। গতরাতে নিহতের স্ত্রী ৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনাস্থল আসামিদের বাড়ি থেকে ট্রাক্টর, লাঠি, ভেলচা সহ মারধরে ব্যবহৃত কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। ঘটনার সাথে যারা জড়িতরা পলাতক রয়েছে। আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।