ঢাকা, আজ রোববার, ২০ জুন ২০২১

প্রতিবন্ধীদের আশার আলো প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র কুমিল্লা

প্রকাশ: ২০২১-০৩-১৭ ০১:২২:৪৭ || আপডেট: ২০২১-০৩-১৭ ০১:২৪:১৭

তৈয়বুর রহমান সোহেল, কুমিল্লা।।
প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে আছে এমন ব্যক্তিদের সেবা দিয়ে তাক লাগিয়েছে প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র কুমিল্লা। কুমিল্লার তিনটি সেবা কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৯৭জন ব্যক্তিকে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮ বার সেবা প্রদান করা হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে থাকা ১০,৭৪২ জন পুরুষ, ৬,৪০১ জন মহিলা ও ১০,৪৫৪ জন শিশু কুমিল্লার সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন।

কুমিল্লায় প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে থাকা অনেক ব্যক্তিই এখন মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন সেবা গ্রহণ করে। বিনামূল্যে ভালো সেবা পাওয়ায় অনেক খুশি সেবা গ্রহণকারীরা।
সেবা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এমন এক ব্যক্তি কুমিল্লার রাণীর বাজার আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকতার্ রবীন্দ্র চন্দ্র সরকার। তিনি জানান,‘আমার শোল্ডার পুরোপুরি ফ্রোজেন হয়ে গিয়েছিল। হাত-পা নাড়ানো একেবারেই বন্ধ, ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিলাম। এখানে থেরাপি নিয়ে আমি প্রায় সুস্থ। শুধু পায়ের সমস্যাটি পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। বাদবাকি সকল প্রতিবন্ধকতা কেটে গেছে।’

দেবিদ্বার এগারো গ্রামের মুর্শেদা আক্তারের মেয়ে শিশু মুনতাহা। ৯মাস বয়সী এ শিশুর বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক ছিল না। হাত-পা নাড়াতে পারতো না, মুখ দিয়েও শব্দ বেরোতো না। গত ২ মাস ধরে তিনি কুমিল্লা আদর্শ সদরের সেবা কেন্দ্রটিতে আসছেন। এখন তার মেয়ে হাত-পা নাড়াতে পারছে। অন্যান্য ভঙ্গিতেও স্বাভাবিকতা এসেছে। শুধু গলায় আওয়াজ আসছে না। মুর্শেদা আক্তার মনে করেন, নিয়মিত সেবা নিলে তার বাচ্চার এ সমস্যাও থাকবে না।

পটুয়াখালীর তাসলিমা আক্তার। তার স্বামী কুমিল্লায় ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে তিনি কুমিল্লায় থাকেন। তার ৩ বছর বয়সী মেয়ে সন্তান তায়েবার ডান পা ও বাম হাতে সমস্যা। গত ৫ মাস ধরে তিনি বাচ্চাকে থেরাপি দিচ্ছেন। এখন তার মেয়ে ভালোর দিকে আছে। তিনি জানান,‘ এখানে পরিবেশ চমৎকার, বিনামূল্যে দারুণ সেবা দেওয়া হয়।’
প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশনের আওতায় বাংলাদেশে ১০৩টি প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। যার মধ্যে কুমিল্লা জেলায় স্থাপিত হয়েছে ৩টি কেন্দ্র। ২০১৫ সালের ১ মার্চ কুমিল্লায় যাত্রা শুরু হয় প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্রের। কুমিল্লার আদর্শ সদর, বরুড়া ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায় এ তিনটি সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
এদিকে প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র কুমিল্লার মোবাইল থেরাপি কার্যক্রম কুমিল্লায় বেশ ফেলেছে। সেবা কেন্দ্র আছে এমন তিনটি উপজেলা বাদ দিয়ে কুমিল্লার বাকি ১৪টি উপজেলায় প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল থেরাপির জন্য একটি গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে কুমিল্লায়। গাড়িটিতে থেরাপি প্রদানের জন্য সকল উপকরণ যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র কুমিল্লা থেকে এ পর্যন্ত ৭০জন প্রতিবন্ধীকে হুইল চেয়ার, ২০জনকে হিয়ারিং এইড, ১০টি টয়লেট চেয়ার, ১০ জোড়া স্ক্র্যাচ ও ৫টি বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক ও নারী সংগঠক ইয়াসমীন রীমা। প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা কেন্দ্রে পাঠান তিনি। ভ্রাম্যমাণ থেরাপি কার্যক্রম নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত তিনি।
ইয়াসমীন রীমা জানান,‘অনেক পরিবার আছে, যারা আত্মসম্মানের ভয়ে বাচ্চাদের গৃহবন্দী করে রাখেন, ডাক্তারদের শরণাপন্ন হতেও দ্বিধাবোধ করেন, মোবাইল থেরাপির কারণে তাদের সে সমস্যা কেটে যাচ্ছে।’
আদর্শ সদর সেবা কেন্দ্রের চিকিৎসক মো. মামুন হোসেন জানান,‘ বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীতার ঝুঁকিতে আছে। তাদের বিনামূল্যে সেবা নেওয়ার সুযোগ আছে, এ বাতার্টা অনেকে ঠিকমতো পাচ্ছেন না। আমরা চাই তাদের কাছে বাতার্টি পৌঁছে দিতে।’
কুমিল্লার প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকতার্ হাসান আহমেদ কামরুল জানান,‘ প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্র কুমিল্লায় ১২জন লোকবল আছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি আছে। স্পিচ থেরাপিস্ট নেই। এ পদটি পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি মহিলা সেবা প্রদানকারী বাড়ানো গেলে সেবার মান আরও ভালো হতো।’

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান জানান,‘ স্পিচ থেরাপিস্ট নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র মূলত প্রতিবন্ধীতার ধরন নির্ণয়, শ্রবণ, দৃষ্টি মাত্রা নির্ণয় , ফিজিওথেরাপি, অকিউপেশনাল থেরাপি, অটিজম বিষয়ক সেবা, কাউন্সিলিং, সহায়ক উপকরণ বিতরণ, সচেতনতা কার্যক্রম, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সেবাও পুনবার্সন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।